
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
মানুষের মৃত্যুর পর মরদেহে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে অনেক সময় স্বজনরাও কাছে যেতে চান না। এমন পরিস্থিতিতে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন নিজেই অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। তিনি শুধু আইনি দায়িত্ব পালনেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, বরং মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে নিজ হাতে মরদেহ উদ্ধারের কাজেও অংশ নেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় অনেক সময় এলাকাবাসী কিংবা স্বজনদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় না। এমন পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের দ্বিধা না করে ওসি জামাল উদ্দিন নিজেই উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করেন।
এ বিষয়ে কথা হলে তাকে প্রশ্ন করা হয়, অর্ধগলিত মরদেহের কাছে গেলে দুর্গন্ধ লাগে না কি?
জবাবে তিনি বলেন, “অবশ্যই লাগে। মানুষ পচে গেলে দুর্গন্ধ ছড়াবে, এটাই স্বাভাবিক। আমিও সেই দুর্গন্ধ অনুভব করি। কিন্তু আমি তো একজন মানুষ। একদিন আমাকেও মরতে হবে। মহান আল্লাহ আমার ভাগ্যে কী মৃত্যু লিখে রেখেছেন, তা আমি জানি না। সবাই যদি দুর্গন্ধের কারণে সরে যায়, তাহলে সেই মরদেহের কী হবে? মানুষ মারা গেলে তো আর অন্য কোনো প্রাণীতে পরিণত হয় না, সে মানুষই থাকে। তাই মানুষ হিসেবেই মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমার দায়িত্ব—হোক সে জীবিত কিংবা মৃত।”
স্বজনদের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অনেক সময় তারা কাগজে-কলমে থাকেন, কিন্তু বাস্তবে কাউকে পাওয়া যায় না।”
অন্য কাউকে দিয়ে এ কাজ করানো যায় কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, “অবশ্যই করানো যায়। কিন্তু সেও তো একজন মানুষ। যে দুর্গন্ধ আমার কাছে লাগে, তার কাছেও একইভাবে লাগবে। তাহলে আমি কেন নিজের দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপিয়ে দেব?”
এ ধরনের কাজ থেকে কী প্রাপ্তি পান—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই, আছে শুধু মানবতা। একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের দায়িত্ববোধ। একটি কুকুর মারা গেলে দুর্গন্ধের কারণে মানুষ দ্রুত সেটিকে মাটিতে পুঁতে দেয়। অথচ একজন মানুষ মারা গেলে তার প্রতিও তো আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। যতদিন বেঁচে থাকব, সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করব।”
সবশেষে তিনি সবার উদ্দেশে বলেন, “মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার দায়িত্ব। কে জীবিত, কে মৃত—তার চেয়েও বড় পরিচয়, সে একজন মানুষ। নিজের মৃত্যু ও পরকালের কথা স্মরণ রেখে মানবতার পথে চলুন। মানবতাই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।”
ওসি জামাল উদ্দিনের এমন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়িত্ববোধ স্থানীয়দের মধ্যে প্রশংসিত হয়েছে। অনেকের মতে, সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের এমন দৃষ্টান্ত সমাজের জন্য অনুকরণীয়।