
আশুলিয়া প্রতিনিধি
ঢাকার সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ মিটার চুরি করে পরে বিকাশের মাধ্যমে টাকা আদায়ের অভিযোগে সংঘবদ্ধ চোরচক্রের দুই সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে শিল্প পুলিশ-১, ঢাকা। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি চোরাই বিদ্যুৎ মিটার, দুটি স্মার্টফোন ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন সিরাজগঞ্জের চৌহালী থানার পাথরাইল গ্রামের কাইয়ুম আলীর ছেলে মো. সবুজ মিয়া ওরফে ‘মিটার সবুজ’ (২৫) এবং একই থানার রেহাই পুকুরিয়া গ্রামের লিটন মোল্লার ছেলে মো. মারুফ মোল্লা (৩৫)।
শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক মাস ধরে সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কৌশলে বিদ্যুৎ মিটার চুরি করে আসছিল। মিটার চুরির পর সেটি আশপাশের কোনো স্থানে লুকিয়ে রেখে ঘটনাস্থলে পলিথিনে মোড়ানো চিরকুটে একটি বিকাশ নম্বর রেখে যেত চক্রের সদস্যরা।
পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে চক্রের সদস্যরা দর-কষাকষির মাধ্যমে বিকাশে টাকা আদায় করত। টাকা পাওয়ার পর চুরি করা মিটার পুনরায় ফেরত দেওয়া হতো।
গত ৫ আগস্ট রাত আনুমানিক ২টা ২৪ মিনিটে ধামরাই থানাধীন ঢুলিভিটা এলাকায় দি একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের কারখানার ১ নম্বর গেটের সামনে পল্লী বিদ্যুতের একটি মিটার চুরি হয়। এ ঘটনায় ধামরাই থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার তদন্তের পাশাপাশি শিল্প পুলিশ-১, ঢাকার একটি বিশেষ দল ছায়া তদন্ত শুরু করে। বিভিন্ন সোর্স ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মিটার চুরি চক্রের সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২ অক্টোবর বিকেল ৩টার দিকে আশুলিয়া থানাধীন পলাশবাড়ী এলাকার ঘোড়াপীর মাজারসংলগ্ন মানিকগঞ্জ বুক হাউসের সামনে অভিযান চালায় শিল্প পুলিশ-১-এর একটি দল।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় মোটরসাইকেলযোগে দ্রুতগতিতে যাওয়ার সময় পুলিশ সদস্যরা তাদের থামার সংকেত দেন। পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে মারুফ মোল্লা মোটরসাইকেল নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ তাদের আটক করতে গেলে মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যায়।
ঘটনায় সবুজ মিয়ার বাম হাতের কব্জিতে এবং মারুফ মোল্লার কপালে আঘাত লাগে। একই সময়ে শিল্প পুলিশের এসআই (নিঃ) মো. তারিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল মো. নাজমুল হাসানও আহত হন। পরে আহতদের সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সবুজ মিয়া শিল্পাঞ্চল থেকে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি মিটার চুরির কথা এবং মারুফ মোল্লা প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি মিটার চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
শিল্প পুলিশ জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে একমি ল্যাবরেটরিজ, স্টারলিং লন্ড্রি অ্যান্ড ডেনিমস, কাইজেন মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জেডব্লিউ কোম্পানি, প্যাক অ্যান্ড টিম প্যাকেজিং, ঝাওফিং জিলেটিন, ম্যাকটেক কর্পোরেশন, আয়েশা ক্লোথিং, হুয়াই ইন্টারন্যাশনাল পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট, ইফাদ অটোস, ট্রেন্ড সেন্ডারস ট্রিমস ইন্ডাস্ট্রিজ, ইউবেস্ট (বাংলা) ফ্যাশন, টর্ক ডিজাইন, এম এম মাল্টিমাইন্ড নিট গার্মেন্টস, সিনলিয়ান ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি বাংলাদেশ ও ফেব্রিলাইফ ফ্যাশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মিটার চুরির তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার সবুজ মিয়ার বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর ও কামারখন্দ, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর ও মির্জাপুর থানায় চুরি, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ মোট ছয়টি মামলা রয়েছে।
অন্যদিকে মারুফ মোল্লার বিরুদ্ধে আশুলিয়া, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর ও মির্জাপুর, সিরাজগঞ্জের চৌহালী, বেলকুচি ও কামারখন্দ এবং মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া ও সিংগাইর থানায় চুরি, দস্যুতা, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ মোট ১০টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযানে তাদের কাছ থেকে একটি বাংলাদেশ রুরাল ইলেকট্রিফিকেশন বোর্ডের (BREB) Hexing মিটার, একটি Vivo Y21D স্মার্টফোন, একটি Tecno KM9 স্মার্টফোন এবং কালো-লাল রঙের একটি Bajaj Pulsar 150 সিসি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।
শিল্প পুলিশ-১, ঢাকা জানিয়েছে, শিল্পাঞ্চলে মিটার চুরি ও এ ধরনের চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।