
পঞ্চগড় প্রতিনিধি:
পঞ্চগড় সদর উপজেলার উত্তর জালাসী এলাকায় অবস্থিত ‘দেশ প্রতিবন্ধী স্কুল’ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। বিদ্যালয়ের কাগজপত্র অনুযায়ী এখানে ২০৪ জন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এবং ২৫ জন স্টাফ থাকার কথা থাকলেও সরেজমিনে পাওয়া গেছে ভিন্ন চিত্র। বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ১৭ জন শিক্ষার্থী ও তিনজন শিক্ষক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়টি প্রায়ই বন্ধ থাকে এবং নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। এরই মধ্যে বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা পর্যালোচনায় শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতিদিন উপস্থিত দেখিয়ে স্বাক্ষর করার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। ফলে কাগজপত্রের তথ্যের সঙ্গে বাস্তব উপস্থিতির মিল না থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ২০৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র ১৭ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত রয়েছে। একই সময়ে ২৫ জন স্টাফের মধ্যে বিদ্যালয়ে পাওয়া যায় মাত্র তিনজন শিক্ষককে।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তসলিমা খাতুন বলেন, “আমি আমার শিফট অনুযায়ী পাঠদান করি। সবাই সপ্তাহে দুই দিন করে আসে। তবে হাজিরা খাতায় প্রতিদিনের স্বাক্ষর হয়।”
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষকরা যদি সপ্তাহে নির্দিষ্ট দুই দিন করে বিদ্যালয়ে আসেন, তাহলে হাজিরা খাতায় প্রতিদিন উপস্থিত দেখিয়ে স্বাক্ষর করা হয় কীভাবে—এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ২৫ জন স্টাফের বিপরীতে বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিও স্পষ্ট নয়।
বিদ্যালয়ের পরিচালক জহিরুল ইসলাম। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উপস্থিতি এবং হাজিরা খাতায় প্রতিদিনের স্বাক্ষরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, “আপনারা আমাদের পজিটিভ সংবাদ প্রচার করেন, যাতে আমাদের বিদ্যালয়টি অনুমোদনপ্রাপ্ত এবং এমপিওভুক্ত হয়।”
বিদ্যালয়ের কার্যক্রম, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি এবং হাজিরা খাতায় নিয়মিত উপস্থিতি দেখানোর বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করেননি।
এদিকে, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত একটি বিদ্যালয়ে কাগজে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক থাকলেও বাস্তবে উপস্থিতি কম থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, বিদ্যালয়ের অনুমোদন, শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষক-কর্মচারীর তালিকা, হাজিরা খাতা, নিয়মিত পাঠদান এবং বাস্তব কার্যক্রম—সবকিছু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
পঞ্চগড় জেলা প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “বিশেষ বিদ্যালয়গুলোর স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তি না থাকায় এগুলো যথাযথভাবে তদারকি করা যাচ্ছে না। অধিকাংশ বিদ্যালয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অধীনে পরিচালিত হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, বেতনসহ সব কার্যক্রম সংস্থার মাধ্যমেই হয়।”
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা, ২০১৯’ অনুযায়ী এসব বিদ্যালয়ের আলাদাভাবে নিবন্ধন প্রয়োজন। নিবন্ধন ছাড়া পরিচালনা বিধিসম্মত নয়। তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে কাজ করায় বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে দেখা হয়। প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ম মেনে চলতে উৎসাহিত করা হবে।
স্থানীয়দের মতে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘দেশ প্রতিবন্ধী স্কুলে’ কাগজে-কলমে থাকা শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংখ্যা, হাজিরা এবং বাস্তব উপস্থিতির তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, শিক্ষকরা শিফটভিত্তিক ও সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে পাঠদান করেন। পাশাপাশি বিদ্যালয়টি অনুমোদন ও এমপিওভুক্ত করার প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন পরিচালক জহিরুল ইসলাম। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই এখন সময়ের দাবি।