
মো. মহিবুল্লাহ মেহেদী
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি, গাইবান্ধা
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধাপাচিলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে মাত্র তিনজন। বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত রয়েছেন আটজন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারী। শিক্ষার্থীর এমন চরম সংকটের মধ্যেও সরকারি অর্থায়নে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম চলমান থাকায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নে অবস্থিত ধাপাচিলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে মাত্র তিনজন শিক্ষার্থী রয়েছে। সপ্তম থেকে দশম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কার্যত শূন্য।
বিদ্যালয়জুড়ে অব্যবস্থাপনার চিত্র
সম্প্রতি সরেজমিনে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বিদ্যালয়ের মাঠজুড়ে কচুরিপানা ও আগাছা ছড়িয়ে আছে। মাঠের মাঝখানে রয়েছে একটি ডোবাও। এতে বিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশ ও নিয়মিত পাঠদান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
১৬০ শিক্ষার্থীর নামে বই উত্তোলনের অভিযোগ
এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ১৬০ জন শিক্ষার্থীর নামে সরকারি পাঠ্যবই উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। অথচ বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রকৃত শিক্ষার্থী মাত্র তিনজন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, ১৬০ জন শিক্ষার্থীর নামে উত্তোলন করা বই কোথায় বিতরণ করা হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত হিসাব কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল মিয়া বলেন, “বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী খুবই কম। কিন্তু ১৬০ জনের নামে বই উত্তোলনের কথা শুনেছি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করা প্রয়োজন।”
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ
এছাড়া স্থানীয়দের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়মিত উপস্থিত না থেকেও সরকারি বিল-ভাতা উত্তোলন করছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আশাদুল জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে বিদ্যালয়ে গিয়েও তাঁর সঙ্গে দেখা না হওয়ায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আশরাফুজ্জামান বলেন, “বিদ্যালয়ের কয়েকটি কক্ষে পানি ওঠার কারণে সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এখন পানি নেমে গেছে। বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। পরিবেশ ঠিক করে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।”
পরিদর্শনে তিন শিক্ষার্থী পাওয়ার দাবি
এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার বেলাল হোসেন বলেন, “ধাপাচিলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি যে এলাকায় অবস্থিত, সেই এলাকার শিক্ষার্থীর তুলনায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী অনেক কম। শিক্ষার্থী বাড়ানোর জন্য কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। জেলা শিক্ষা অফিসার বিদ্যালয়টি দুইবার পরিদর্শন করেছেন। দুইবারই মাত্র তিনজন শিক্ষার্থী পাওয়া গেছে।”
গাইবান্ধার জেলা শিক্ষা অফিসার আতাউর রহমান বলেন, “আমরা বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদন ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মাত্র তিনজন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১১ জন শিক্ষক-কর্মচারীর কর্মরত থাকা, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও পরিবেশের বেহাল দশা এবং ১৬০ জন শিক্ষার্থীর নামে পাঠ্যবই উত্তোলনের অভিযোগ—সব মিলিয়ে ধাপাচিলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।